বিজয়ের চার দশকঃ অর্জন ও বিসর্জন; একটি অর্থনৈতিক পাঠ

বিজয়ের চার দশকঃ অর্জন ও বিসর্জন; একটি অর্থনৈতিক পাঠ ।। আলাউদ্দীন মোহাম্মদ

DUCSU ক্যাফেটেরিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সময়ঃ ১৪ ডিসেম্বর, সন্ধ্যা ০৬.০০ টা।

ঢাকা ইউনিভার্সিটি রিডিং ক্লাবের ৪৭-তম সেশনের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিলো “বিজয়ের চার দশকঃ অর্জন ও বিসর্জন; একটি অর্থনৈতিক পাঠ”।

শুরুতেই সঞ্চালক কে. এন. ইপ্সিতা এবং জুলফিকার ইসলাম অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের অর্জন ও বিসর্জন কে বেছে নেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন। এরপর মূল বক্তা তাঁর আলোচনা শুরু করেন।

তিনি তাঁর আলোচনায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান, এক্ষেত্রে উন্নয়ন অর্থনীতির আলোকে এর কি ব্যাখ্যা এবং প্রাসঙ্গিক ফিলিপ বউরিং এর উন্নয়ন ধাঁধাঁ তর্কের উল্লেখ করেন । এছাড়াও এখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন (WB, IMF, OECD, G-8, D-8) এর ভূমিকা ও উদ্দেশ্য যে মূলত অর্থনৈতিক অর্জনকে টার্গেট করেই হয় সে বিষয়টির দিকে ঈঙ্গিত দেন। তারপর বক্তা তাঁর বক্তব্যে একটি রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য বর্ণনা করেন। এসময় তিনি একটি রাষ্ট্রের অর্জন মানেই প্রধানত অর্থনৈতিক অর্জন বলে মন্তব্য করেন। ভেঙ্গে বলেন এইভাবে যে রাষ্ট্রিক সব অর্জন মূলত অর্থনৈতিক অর্জনের দিকেই ধাবিত হয়। তাই একটি রাষ্ট্রের সফলতা ব্যার্থতার পাঠ মানেই সে রাষ্ট্রের অর্থনীতির পাঠ বলে তিনি মনে করেন।

১৯৪৭ সালের ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি রাষ্ট্রের সৃষ্টির পর থেকে  পাকিস্তানের দু’অংশে দু’রকম অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু ছিল। ১৯৬৭ সালে অধ্যাপক রওনক জাহানের দ্বি-অর্থনৈতিক তত্ত্ব থেকে আমরা তার তাত্ত্বিক ভিত্তি জানতে পারি। পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি পশ্চিম অংশের বিমাতা সুলভ আচরণের কারণে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে। তাই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির তাত্বিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান ছিল মুলত এ অর্থনৈতিক চেতনা। আর তাই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির চেতনাকে এক কথায় বলা যায়, নিজের সম্পদ নিজের প্রয়োজনে নিজের স্বাধীনতায় ভোগদখলের চেতনা। তবে এটি অনেকগুলো চেতনার একটু এবং ব্যক্তিকভাবে বক্তা মনে করেন প্রধানতম।

তারপর তিনি  স্বাধীনতার পরবর্তী সময় কে দু’টি অংশে ভাগ করে আলোচনাকে নতুন মাত্রা দেন।  দুই অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়। ওয়াশিংটন কনসেন্সাস থেকে জুডিপিকেন্দ্রিক উন্নয়ন থেকে বিবর্তিত উন্নয়ন ধারনার আলোকে জাতীয় উন্নয়ন, মানব উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, মাথাপিছু আয় ও জিএনপি. এর বৃদ্ধি, নারী শিক্ষার প্রসার, গড় আয়ু এ ইনডিকেটর গুলোতে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের  তুলনা এবং এক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে  বাংলাদেশের এগিয়ে থাকা, এ প্রসঙ্গে কিছু পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয় যেখানে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর দিক দিয়ে ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর একমাত্র জাপানের উন্নয়নের সাথে এটি তুলনা করা যায় বলে ইকোনোমিস্টের এক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এর স্থায়িত্ব নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা স্বত্ত্বেও বাংলাদেশ যে ২০১২ সালে টিকে আছে এইটাইকে তিনি আজকে বাংলাদেশের প্রধান অর্জন বলে আখ্যা দেন। আর তারপর বাংলাদেশ যা অর্জন করেছে তাকে তিনি বলেন , এগুলো কৃতিত্ব। যার কারণে আবার জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশ পুরস্কৃতও হয়।

বিসর্জন সম্পর্কে বক্তা মন্তব্য করেন, আজকে যেহেতু আমরা একটি নির্দিষ্ট দিকে দৃষ্টি রেখেছি তার হিসেবে আমাদের কোন বিসর্জন নেই। তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক পাল্লায় বাংলাদেশের কোন ব্যার্থতা নেই। বাংলাদেশের বিসর্জনের দুইটি দিক তিনি তুলে ধরেন। এরমধ্যে এক নম্বর হল, জাতি হিসেবে বাংলাদেশ আজ বিভক্ত যেটা ১৯৭১ কিংবা এর পরবর্তি প্রথমদিক গুলোতে ছিল না। এবং এ বিভক্তি ক্রমশ বাড়ছেই। আর দুই নম্বরে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বানাতে পারিনি। এবং রাষ্ট্র একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আজ খুবই নড়বড়ে। আর এর ফল হিসেবে আমাদের মাঝে আশ্রয় নিয়েছে দূর্ণীতি, দুর্বৃত্তায়ন আর ভাতৃঘাতী সংঘাত। এই প্রসঙ্গে বক্তা আবার শুরুর উন্নয়ন ধাঁধাঁ প্রসঙ্গে ফিরে যান এবং এই দ্বিমুখীতাই সেই ধাঁধাঁ র জন্ম দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন। কারণ, অর্থনীতিতে ধরে নেওয়া হয় যে কোন রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক স্থীতিশীলতা হল পুর্বশর্ত যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খাটেনি।

তো প্রশ্ন হল, তাহলে এই উন্নয়ন কেমন করে অর্জিত হল??

বক্তা এর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দুইটি কারণের উল্লেখ করেন। প্রথম হল, এনজিওদের ভুমিকা যেটি আবার সম্ভব হয়েছে ৮০ র দশকের এনজিও কর্মীদের সক্রিয় বাম রাজনীতির সাথে সংযোগ যা থেকে গণমুখীতা এবং দেশের জন্য কিছু করার তাড়না। আর দুই হল, আমাদের বাংলাদেশী জনগণের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের অদম্য শক্তি। এ প্রসঙ্গে তিনি আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শ্রেণী থেকে শুরু করে রাস্তায় চা বিক্রেতার জীবনের টিকে থাকার লড়াইকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।

এ পর্যায়ে বক্তা তার বক্তব্য গুটিয়ে নিয়ে আসেন এবং আমরা যারা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করছি তারা আমাদের শক্তি সম্পর্কে অবগত কিনা সে প্রশ্ন করেন। নিজেই এর উত্তর টেনে বলেন, স্রোতের অনুকুলে নৌকা চলতে শুরু করলে তা সামনের দিকেই যাবে। কিন্তু তা কি বেগে যাবে এবং কোথায় গিয়ে ঠেকবে একজন দক্ষ নাবিকই পারে তার নিয়ন্ত্রণকে সামলাতে।

তার ভাষায়, “আজ সময় এসেছে ঠিক করার বাংলাদেশ নামক তরণী আমরা কিভাবে চালাব”

পরিশেষে বক্তা তার বক্তব্য থেকে ‘বিসর্জন’কে বিসর্জন দিয়ে বক্তৃতার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

এরপর আলোচনা প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।

Advertisements

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s