কেইনসিয় অর্থনীতি কি?

 

Image

অর্থনীতিশাস্ত্রের কথা মাথায় আসলেই যে দুইটি ধারণা মনের কোণে ভেসে উঠে তা হল মাইক্রো অর্থনীতি এবং ম্যাক্রো অর্থনীতি। অবাক করা বিষয় হল এই ম্যাক্রো বা সামষ্টিক অর্থনীতি চর্চা শুরু হয়েছে কিন্তু বেশিদিন হয়নি। মাত্র গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের মহামন্দা থেকে অর্থনীতিকে পূনরুদ্ধারে মহামতি কেইনস যে বটিকা দিয়েছিলেন তাই শেষ পর্যন্ত নতুন এক সাবডিসিপ্লিনের জন্ম দিয়ে ফেলেছে যেটা আজ আমরা সামষ্টিক অর্থনীতি নামে চিনে থাকি। কেইনসকে এবং কেইনসিয় অর্থনীতি বোঝা তাই এই শাস্ত্রের বিবর্তন বোঝার গুরুত্বপূর্ণ এক দিক।

কেইনসিয় অর্থনীতির শুরু মূলত ‘The General Theory of Employment, Interest and Money’ (1936), এর মাধ্যমে, যা ১৯৩০-এর অর্থনৈতিক মহামন্দা-র প্রেক্ষাপটে সামষ্টিক অর্থনীতির একটি বিশেষ তত্বের সূচনা করে। কেইনসিয় অর্থনীতির মূল প্রস্তাব অর্থনৈতিক মন্দা নিরসনার্থে সরকারের তরফে অর্থনীতির সম্প্রসারণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।

এই বইটি Short Run বা স্বল্প মেয়াদে যেখানে মূল্যস্তর Sticky বা সম্পর্কযুক্তভাবে অবাধ সেখানে জাতীয় আয়ের নির্ণায়ক নির্ধারণের উপর গুরুত্ব দেয়। Low Effective Demand বা নিম্ন সক্রিয় চাহিদার কারণে শ্রম বাজারে High Unemployment কখনই শেষ হবে না এবং সেক্ষেত্রে আর্থিক নীতি কেন অকার্যকর হয় কেইনস তার এক বৃহৎ তাত্ত্বিক বিশ্লেষন হাজির করেছেন এই গ্রন্থে। তাই অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ প্রভাবিত করণের ক্ষেত্রেও এই বইটিকেই মূলত কেইনসিয় বিপ্লব বলে আখ্যায়িত করা হয়।

কেইনসিয়ান অর্থনীতির দুইটি সাফল্য উল্লেখযোগ্য। প্রথম হলো, কেইনস-পরবর্তী অর্থনীতিতে সামষ্টিক অর্থনীতির চলক সমূহ ও এর প্রক্রিয়া সমন্বয়ের উপর ভালো করেই জোর দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, এই মডেল গুলোতে ব্যষ্টিক কাঠামোর বিশ্লেষনে সবকিছুরই সরল সর্বোচ্চকরন মডেল থেকে বাস্তব জীবনপ্রণালী ও তার অভ্যাসসমূহ কীভাবে অর্থনীতির তত্বগুলোকে(মূলত অনুমিতি শর্তগুলোকে বাতিল) পরিবর্তন করে দেয় সে বিষয় বিবেচনাকেই বিশ্লেষণের মূলভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। কেইনসের তত্বগুলোর কাটাছেড়া বেশিরভাগই হয়েছে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর এগুলো জনপ্রিয় করেছেন আরেকজন তাত্বিক জোয়ান রবিনসন। তাই আজকাল আমরা ক্যম্ব্রিজ স্কুল নাম শুনলেই বুঝতে পারি এঁরা Demand Sider Economists মানে তাঁরা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে রাষ্ট্র কর্তৃক চাহিদাকে উস্কে দেয়ার তত্বে বিশ্বাসী।

কেইনসের বিশ্লেষণ আরেকটি উপধারার সূচনা করেছে যেটাকে অনেকে নব্য কেইন্সিয়ান অর্থনীতি বলেও আখ্যা দিয়ে থাকেন। এই ধারার তাত্বিকগণ ব্যষ্টিক কাঠামোতে ব্যবহৃত মডেল সমূহ ও আচরণ উন্নয়নে অন্য অর্থনীতিবিদদের সহিত প্রচেষ্টা ভাগাভাগি করেন কিন্তু আদর্শ কেইনসিয়ান কাঠামোর নিম্ন প্রতিফলন যেমন দাম ও শ্রমিকের বেতনের সংবেদনশীলতা বা অস্থিতিস্থাপকতা ইত্যাদির কারণে তা এগোতে পারেনি। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, এগুলো স্বাভাবিকভাবে তৈরি করা মডেলসমূহের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্টের জন্য যতটা না দূর্বল হয়েছে তার চেয়ে মূলত কেইনসিয়ান অভিব্যক্তির সাধারণ অনুমিত শর্তের জন্য।

সে যাই হোক আমাদের সময়ে আসি। 🙂 ২০০৮ সালে যে রিসেশন শুরু হয়েছে সে থেকে উদ্ধারের জন্যে কিন্তু বারাক ওবামা কেইনসের কাছেই ফেরত গিয়েছিলেন। ফেডারেল গবমেন্টের ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ’ নামের যে উদ্ধার প্রকল্প সেটা মূলত ১৯৩০ এর ‘নিউ ডিল’ এর এক নতুন ভার্সনই বটে যেখানে সরকার একদিকে পয়সা খরচ করে কর্পোরেটকে উদ্ধার করবেন(২০০৮ সালে এই কর্পোরেটরা ব্যক্তিগত হেলিকপ্টারে চেপেই অনুদানের পয়সা নিতে গিয়েছিলেন) এবং অন্যদিকে পাবলিকের হাতে টাকা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করবেন যা দিয়ে বাজার আবার সচল হবে এবং অর্থনীতি চাঙ্গা হবে।

কেইনসের তত্ব নিয়ে শেষ যে কথাটা বলা যায়, বিপদে পড়লে আই মিন অর্থনৈতিক মন্দার সময় সবাই কেইনসের কাছেই ফিরে যান বটে কিন্তু মন্দা শেষ হলেই আবার যোগান তত্বের কড়া সমর্থক হয়ে পড়েন যেটা দিয়ে আবার মন্দার দিকে অর্থনীতিকে ঠেলে দেওয়া হয়। কেইনসের ড্রাফট করা ব্রিটনউডস প্রতিষ্ঠান জারি রয়েছে কিন্তু কেইনসের সাজেশন সেখানে স্থান পায়নি। কেইনসের প্রস্তাবকৃত একটা বৈশ্বিক মুদ্রা আজো চালু হয় নি যেটি কমবেশ সব অর্থনীতির লেনদেন সমস্যার সাথে জড়িত।

Advertisements

2 Comments

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s