রাষ্ট্র কখন ব্যার্থ হয়: Why Nations Fail এর পাঠ প্রতিক্রিয়া

Why-Nations-Fail

বাংলাদেশের ৪৪ বছরে পদার্পনের প্রাক্কালে দেখছিলামএমআইটি’র অধ্যাপক ডারেন এসেমোগলু এবং হার্ভাডের অধ্যাপক জেমস রবিনসনের লিখা Why Nations Fail: The Origin of Power, Prosperity, and Poverty বইটি। অর্থনীতি এবং রাজনীতির যুগপৎ সম্পর্ক নিয়ে লিখা এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১২ সালের মার্চে। ৫৪৬ পৃষ্ঠার বইটি অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনীতি এবং রাজনীতি দুই দুনিয়ায়ই ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় বইয়ের তথ্য এবং বক্তব্যগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত রিভিয়্যু শেষে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছি এই লেখায়।

১৫ চ্যাপ্টারের বইটিতে লেখকদ্বয় কোন দেশের কিংবা রাষ্ট্রের সাকসেস অথবা ব্যার্থতাকে দেশটির অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় কিংবা সমন্বয়হীনতার ফল হিসেবে।এই বইয়ে দাবি করা হয়েছে যে, দুইটি দেশের মধ্যকার পার্থক্য প্রধানত তৈরি হয় তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। একটি দেশ এগিয়ে যায় যখন তা ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলকরাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারে, আর এই প্রতিষ্ঠানগুলো যাদের ক্ষেত্রে অল্প কিছু লোকের লুন্ঠন এবং ফায়দা লোটার হাতিয়ার হয় তখনই রাষ্ট্র ব্যার্থ হয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান মানে হল এমন প্রতিষ্ঠান যেগুলো সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা নিশ্চিত করে, সবার জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করে, নতুন প্রযুক্তি এবং দক্ষতায় বিনিয়োগ করার পাশাপাশি সামগ্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন নিশ্চিত করে।

অন্তর্ভূক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান আবার অন্তর্ভূক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা সাপোর্টেড হতে হয়। কারণ অন্তর্ভূক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক ক্ষমতাকে একটি প্লুরালিস্টিক বা বহুত্ববাদী উপায়ে বন্টন করে যাতে করে কিছুটা রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে পারে যেটি আবার মালিকানার অধিকার এবং অন্তর্ভূক্তিমূলক বাজার অর্থনীতির পূর্বশর্ত। অন্যদিকে লুন্ঠক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করে রাখে সেগুলো তাদের মত করে লুণ্ঠনকারী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে রাষ্ট্রক্ষমতা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য।

এসেমোগলু একটা সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেন যে, এই বইয়ের মৌল পয়েন্ট হল যে ধরণের জাতিগুলো রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পেরেছে যেগুলো প্রতিটি নাগরিকের উদ্ভাবনী উদ্যম এবং সম্ভাবনাকে নিরাপত্তা দান করে এবং তাদের সুষ্ঠু বিকাশে সাহায্য করে থাকে। তাঁরা দেখিয়েছেন কিভাবে সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের পর ওয়েস্টার্ন ইউরোপের জর্জিয়া, উজবেকিস্তান কিংবা ইজরায়েলের সাথে আরব বিশ্বেরপারফর্মেন্স আলাদা হয়েছে কিংবা কিভাবে কুর্দিস্তান ইরাকের অন্যান্য অঞ্চল থেকে নিজেদের আলাদা করে পরিচিত এবং সে পরিচয়ে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত অর্জন লাভ করতে পেরেছে। এই পার্থক্যগুলোই লেখকদ্বয় ব্যাখ্যা করেন রাষ্ট্রসমুহের প্রতিষ্ঠানগুলোর পার্থক্য বিশ্লেষণ করে।

চীনের সাফল্য দেখাতে গিয়ে তাঁরা বলেন,ইতিহাসের শিক্ষা হল যথার্থ রাজনীতি কিংবা রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত না হলে অর্থনীতিও ঠিক হবে না। ঠিক এই কারণেই অন্য কোন রাষ্ট্র রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে কম্বিনেশন চীন করতে পেরেছে সেইটা গ্রহণ করতে পারবে না। এসেমোগলুর মতে, চীন কমিউনিস্ট পার্টির অথোরিটারিয়ান হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এক্সট্রাক্টিভ বা লুণ্ঠনকারীপ্রতিষ্ঠানের দ্বারা প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতাকে একচেটিয়াভাবে কুক্ষিগত করতে পেরেছে এবং ব্যাপক পরিসরে সম্পদের সঞ্চালন করতে পেরেছে বলেই মূলত চীন একটি নিম্ন ভিত্তিরপ্রবৃদ্ধি থেকে একটি উচ্চমাত্রার প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। কিন্তু লেখকের মতে, এই প্রবৃদ্ধি টেকসই নয় কারণ এইটা ‘ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন’কে প্রোমোট করে না যেটি উদ্ভাবন এবং উচ্চ আয়ের জন্য অতীব দরকারী।

টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দরকার নতুন নতুন উদ্ভাবন। উদ্ভাবনকে কখনোই ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না যেটি পুরাতনকে নতুনের দ্বারা প্রতিস্থাপন করে এবং রাজনীতির বিদ্যমান ক্ষমতা সম্পর্ককে অস্থীতিশীল করে দেয়।

চীন যতক্ষন পর্যন্ত ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন স্টেজে না উত্তরণ ঘটাতে পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত চীন তার প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে পারবে না। লেখক দাবি করেন, চীনে কি এটা সম্ভব যে, বিশ বছর বয়সী একজন কলেজ পালানো ছেলে নতুন একটা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং তার মাধ্যমে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিভিত্তিক গোটা ব্যবস্থাটাকেই চ্যালেঞ্জ করবে?

৯/১১ এর পর আরব বিশ্ব এবং আফগানিস্তান যেভাবে খারাপ অবস্থার দিকে চলে গেল তার মূলে যে গণতন্ত্রের অভাবপশ্চিমাদের সে চিন্তাটা যে ভুল ছিল না তা এসেমোগলু স্বীকার করেন। কিন্তু যেটা ভুল ছিল বলে তিনি মনে করেন সেটা হল এই চিন্তা যে, আমরা আরব বিশ্বে গণতন্ত্র রপ্তানি করতে পারব। টেকসই গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আসতে হয় তৃণমূল পর্যায়ের সংগ্রাম থেকে। কিন্তু সেটা আবার এটা নয় যে বাইরের শক্তির কিছুই করার নেই।

উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র মিশরে মিলিটারি সহায়তা কমিয়ে দিয়ে সেখানকার আভ্যন্তরীণ খাতগুলোকে রাজনীতিতে ভোকাল হওয়ার জন্য প্রমোট করতে পারে। এই মুহুর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সাহায্য যাচ্ছে মিশর, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে যেখানে সত্যিকার অর্থে আমরা তাদের এলিটগুলোকে খারাপ ব্যবহারে সম্পৃক্ত না হওয়ার জন্য পয়সা ঘুষ দিচ্ছি। অথচ এই পয়সাগুলোই তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির জন্য ঢাললে এগুলো আরো আকর্ষণীয় এবং কার্যকর হতো।

এসেমগলু পরামর্শ দেন যে কায়রোকে আরো ১.৩ বিলিয়ন ডলারের মিলিটারি সাহায্য না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মিশরকে বাধ্য করতে পারে এই সাহায্য নেওয়ার জন্য একটা কমিটি করতে যে কমিটি থেকে যথার্থ উপায়ে ধরে ধরে প্রস্তাব পাঠানো হবে যে কোন কোন স্কুল, হাসপাতাল কিংবা তদ্রুপ প্রতিষ্ঠানের জন্য তাদের বৈদেশিক সাহায্য দরকার। যদি যুক্তরাষ্ট্র কাউকে পয়সা দিতে চায় তাহলে এটা যাতে তৃণমূলকে শক্তিশালী করে এবং সার্বিকভাবে আলোচনার টেবিলকে প্রমোট করে সেই লক্ষ্যে দেওয়া উচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের পলিসির কথা বলতে গিয়ে লেখক বলেন, বাহির থেকে আমরা কেবল একটি ‘ফোর্সড মাল্টিপ্লাইয়ার’ হিসেবে কাজ করতে পারি। যেখানে তোমার তৃণমূল আন্দোলন আছে যার মাধ্যমে তুমি অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে চাও তাহলে আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারি। কিন্তু আমরা তো তৈরি কিংবা প্রতিস্থাপন করতে পারি না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা আফগানিস্তান এবং আরব রাষ্ট্রগুলোতে তৃণমূল আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করছি। তাই সেখানে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তুমি যদি ০ দিয়ে ১০০ কে মাল্টিপ্লাই করো তুমি শূন্যই পাবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান তৈরি না করে যতই কারদানী করো আখেরে কিছুই লাভ হবে না। সবকিছুই পূর্বের প্রতিষ্ঠানেই ফিরে যাবে।

আমেরিকা রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলতে গিয়ে এসেমোগলু বলেন, আমেরিকায় যে হারে চরম বৈষম্য বাড়ছে তা আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলো আমলেই নিচ্ছে না। কিন্তু এইটার তো একটা পালটা প্রতিক্রিয়া আছে।যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য বড় হয়ে দেখা দেয় তখন এটি রাজনৈতিক বৈষম্যে রূপ নেয়। আর রাজনীতিতে যখন একজন ব্যক্তি তোমার গোটা প্রচারণার অর্থায়নের চেক লিখে দিতে পারে তখন তুমি কিসের জন্য অন্তর্ভূক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গঠনের দিকে মনোযোগী হবে? আমেরিকা ঠিক এই গ্যাঁড়াকলে পড়ে গেছে।

গত ৪৪ বছরে বিভিন্ন রকম হতাশার কথা শোনা গেলেও বাংলাদেশ কিন্তু উন্নয়নের প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করে ফেলেছে। বলা বাহুল্য এই উন্নয়নে সুশাসন বড় কোন ভূমিকা রাখেনি। এইটা অনেকটা “ভিক্ষার চাল কাড়া আর আকাড়া” প্রবাদের মত। আপনি যখন ক্ষুধার্ত তখন আপনি যেকোন উপায়ে উদরপূর্তি করতেই চাইবেন, এর বেশি হলে ভালো হয়, কিন্তু অপরিহার্য নয়। কিন্তু ক্ষুধা মিটে গেলে কি করবেন?

বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে এখন চরম ক্ষুধার স্তর থেকে বেরিয়ে আসছে বলা যায় যদিও সার্বিকভাবে ক্ষুধা-দারিদ্র্য এখনো কাংক্ষিত মাত্রায় কমেনি। সংখ্যার দিক দিয়ে বড় একটা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটে গেছে। তাদের এখন নগরে এবং নগরের বাইরে মোটামুটি মাত্রার ব্যক্তিমালিকানা সম্পত্তিও হয়েছে। এইটার একটা প্রতিফলন দেখা গিয়েছে বিগত দিনগুলোতে মধ্যবিত্তের মাঠের রাজনীতিতে কম অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। সহজ হিসাব, রাজনীতির রুটি-হালুয়া ছাড়াও বিকল্প পথ এতোদিনে তার তৈরি হয়ে গিয়েছে। তাই যা অর্জন হয়েছে তা সে হারাতে চায় না।

ঠিক এই জায়গায়ই ডারেন এসেমোগলু’র কাজের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাই। এই জায়গায় এসেই মনে হয়, আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সংখ্যালঘুর সম্পত্তি ও সর্বজনের জানমালের নিরাপত্তা দেবার জন্য এই রাষ্ট্রে কার্যকর কিছু দরকার। তা না হলে স্বতস্ফূর্ত মধ্যবিত্তের এই অর্জনও হারিয়ে যাবে। বর্ডারের ওপারে পাড়ি দেবে। মানুষ যখন জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার অভাবে কোন রাষ্ট্র ছাড়ে তখনই তো সে রাষ্ট্র ব্যার্থ হয়!

বাংলাদেশ আজ ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সংখ্যালঘুর জীবন ও সম্পত্তি নিরাপদ নয়, বাঙালি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর, ভিন্ন মতাদর্শিক গোষ্ঠীর জীবন ও সম্পত্তি এখানে নিরাপদ নয়। এখানে ব্যক্তি ধারণায় ফাটল ধরেছে, আর এই ফাটল টেনে নিয়ে যাচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক ফাটলে।

এই মুহুর্ত থেকেই এই ফাটল সারাবার ব্যবস্থা না নিলে রাষ্ট্রের ব্যার্থতা এড়ানো সহজসাধ্য হবে না!

দোহাই:

1)      DaronAcemoglu& James Robinson, Why Nations Fail: The Origin of Power, Prosperity, and Poverty, Crown Business, US, 2012

2)      www.whynationsfail.com

3)      TL Friedman, Opinion on Why Nations Fail,  New York Times, 2012

Advertisements

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s